বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

মেজর সিনহা হত্যা: কী ঘটেছিল সেদিন

নিউজ ডেস্ক
  • Update Time : সোমবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২২, ২:৪৮ pm
  • ২ Time View

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। সোমবার (৩১ জানুয়ারি) এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল রায় ঘোষণা করবেন।

মেজর সিনহা হত্যার ঘটনার পাচদিন পর ২০২০ সালের ৫ আগস্ট মেজর নিহতের বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

২০২০ সালের ৬ আগস্ট ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকতসহ মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় তিন বাসিন্দা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য ও ওসি প্রদীপের দেহরক্ষীসহ আরও সাত জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

এরপর মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসে।

পাশাপাশি সিনহা নিহতের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে অতিরিক্ত ডিআইজি এবং লে. কর্নেল মর্যাদার একজন সেনা কর্মকর্তাকে সদস্য করে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সিনহা তার সঙ্গী সিফাতকে সঙ্গে নিয়ে মারিশবুনিয়ার টুইন্যার পাহাড়ে ‘টাইম ল্যাপস’ ভিডিও করতে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যার পর পাহাড়ে আলো দেখে স্থানীয় কয়েকজন তাদের ডাকাত বলে সন্দেহ করেন।

তদন্ত কমিটির কাছে পরিদর্শক লিয়াকত বলেছেন, মারিশবুনিয়া গ্রামের কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সেক্রেটারি নুরুল আমিন তাকে ফোন করে বলেছিলেন যে পাহাড়ে ডাকাতেরা ছোট ছোট আলো ফেলে ঘোরাঘুরি করছে। লিয়াকত তখন মাদক উদ্ধার অভিযান থেকে ফিরছিলেন। নুরুল আমিন আবার ফোন করে বলেন, সেনাবাহিনীর পোশাক পরা সেই লোকেরা গ্রামবাসীকে গুলি করেছেন। তারা সিলভার রঙের গাড়িতে করে কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছেন। নুরুল আমিনও কমিটির কাছে একই কথা বলেছেন। কমিটি বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ৩৫ জন পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, যারা কেউই এ কথা জানতেন না। কথা হয়েছে শুধু লিয়াকত ও নুরুল আমিনের মধ্যে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, লিয়াকত সে খবর কাউকে জানাননি। এমনকি ওসি বা ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তাকেও না। তিনি খবর যাচাই করার জন্য ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান বা স্থানীয় কাউকে ফোন করেননি। কোনো সহকর্মীকেও সেটা বলেননি। লিয়াকত কমিটিকে বলেছেন, খবর যাচাই করার সময় তিনি পাননি। মারিশবুনিয়ার মসজিদ থেকে যখন ‘ডাকাত’ বলে মাইকিং করা হচ্ছিল, তখন নিষেধ করেছিলেন ইমাম জহির আলম। তিনি বলেছিলেন, তারা সেনাবাহিনীর লোক। পাহাড়ে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছিল।

পাহাড় থেকে নেমে শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে আসার আগে সিনহা বিজিবির একটি চৌকিতে থেমেছিলেন। বিজিবির সদস্যরা সিনহার পরিচয় জানার পর তাকে স্যালুট করেছিলেন। সেখান থেকে ছয় কিলোমিটার আসার পর শামলাপুর তল্লাশিচৌকি, যেখানে সিনহাকে গুলি করা হয়। এর এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে সেনাবাহিনীর তল্লাশিচৌকি।

এপিবিএনের সদস্যরা কমিটিকে বলেছেন, লিয়াকত চৌকিতে এসে কিছু বলেননি। তিনি শুধু তল্লাশিচৌকির এসআই শাজাহানকে ফোন করেছিলেন। তাছাড়া তিনি যখন ফোনে ডাকাতের খবর পেয়েছিলেন, তখনো তার সঙ্গে পুলিশের একটি দল ছিল। কিন্তু তিনি কাউকে না জানিয়ে একাই অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সিনহার গাড়ি তল্লাশিচৌকিতে এলে কনস্টেবল রাজীব সংকেত দেন। গাড়ি থেমে যায়। বাঁ দিকের কাচ নামিয়ে সিনহা পরিচয় দিলে এসআই শাজাহান পেছনে সরে যান। গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। এরপর লিয়াকত এসে ব্যারিকেড দিয়ে পিস্তল তাক করেন। সিনহাকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন।

গুলিবর্ষণকারী লিয়াকত কমিটিকে বলেছেন, ‘সিনহা গাড়ি থেকে নেমে উত্তেজিত হয়ে আমার দিকে গুলি করেন। ’ তবে কমিটির জেরায় লিয়াকত বলেছেন, গাড়ি থেকে নামার সময় সিনহা ডান হাত কোমরে রাখেন, এরপর পিস্তল তাক করে গুলি করেন।

কমিটি প্রতিবেদনে বলেছে, সবাই বলেছেন, সিনহার বাঁ হাত ওপরে ছিল। কিন্তু ডান হাত কোথায় ছিল, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। একেকজন একেক কথা বলেছেন।

তদন্ত কমিটির কাছে লিয়াকত বলেছেন, তিনি জানমালের নিরাপত্তার জন্য গুলি করেছিলেন। কিন্তু এসআই শাজাহান বলেন, ওই সময় লিয়াকতের স্থলে তিনি হলে গুলি করতেন না। গুলি করার কারণ হিসেবে তিনি লিয়াকতের অনভিজ্ঞতা ও সোর্সের ওপর অতিনির্ভরশীলতাকে দায়ী করেছেন।

কনস্টেবল রাজীব বলেছেন, লিয়াকত গুলি না করলে সিনহা গুলি করতেন কি না, তা তিনি বুঝতে পারেননি। আবার নন্দদুলালের কাছে কমিটি জানতে চেয়েছিল, ওই সময় লিয়াকতের জীবনের কোনো শঙ্কা ছিল কি না? জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমি এ রকম চিন্তা করিনি। ’

অন্য সব সাক্ষী কমিটির কাছে যেসব কথা বলেছেন, তাতে কমিটি মনে করে, সিনহাকে মেরে ফেলার জন্য গুলি করা হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক কমিটিকে বলেছেন, একটি গুলি দূর থেকে করা হলেও পরের সব গুলি খুব কাছ থেকে করা হয়েছিল।

সিনহাকে গুলি করার ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর প্রদীপ ঘটনাস্থলে আসেন। এর আগে সিনহাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রদীপ আসার ২২ মিনিট পর সিনহাকে ট্রাকে তোলা হয়। কমিটি বলেছে, হাসপাতালে যেতে অস্বাভাবিক দেরি হওয়ায় বিনা চিকিৎসায় সিনহা মারা যান।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
আর্কাইভ
© ২০২২-২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দেশ ভয়েস।
jphostbd.com