বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কিভাবে নির্বাচিত হন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • Update Time : রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১১:০২ pm
  • ৬ Time View

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডার দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীয় চরিত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই পদে ৩৬ বছর ছয় মাসেরও বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। এই পদটি ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে আলী খামেনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন।

নির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতা ইরানের রাজনীতি ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ধারণ করেন। তিনি রাষ্ট্রের সাধারণ নীতিমালা নির্ধারণ এবং আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের তদারকি করেন। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিক কর্তৃত্বশীল ব্যক্তি, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, আর্মি অব ইরান ও কুদস ফোর্সসহ সব সামরিক বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ ও প্রত্যাহারের ক্ষমতাও রাখেন তিনি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি, গণভোটের ডিক্রি, যুদ্ধ বা শান্তির ঘোষণা, প্রধান বিচারপতি ও প্রেসিডেন্টের অপসারণের ক্ষমতাও সর্বোচ্চ নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেও তার কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদন বা তত্ত্বাবধানে হয়।

সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন ‘সুপ্রিম লিডার্স কাউন্সিল’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে, যা ৮৮ জন ধর্মীয় আলেম নিয়ে গঠিত। প্রতি আট বছর পর ইরানের কোটি কোটি নাগরিক এই পরিষদের সদস্যদের নির্বাচিত করেন। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০১৬ সালে। সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য অবশ্য গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন, যাদের সদস্যদের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সর্বোচ্চ নেতার মনোনীত।

নতুন নেতার নির্বাচনে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন এবং বৈধ নির্বাচনের জন্য অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য উপস্থিত থাকতে হবে।

যাদের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে উপযুক্ত বিবেচনা করা হতে পারে- এমন সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকে সুপ্রিম লিডার্স কাউন্সিলের একটি কমিশন।

এই কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মধ্যে আছেন গার্ডিয়ান কাউন্সিল অব জুরিসপ্রুডেন্সের সদস্য আহমদ হোসেইনি খোরাসানি; গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আলী রেজা উর্ফি ও মোহাম্মদ রেজা মাদ্রাসি ইয়াজদি; সর্বোচ্চ নেতার পরিষদের প্রথম সহসভাপতি হাশেম হোসেইনি বুশেহরি; ইউরোপে আয়াতুল্লাহ খামেনির সাবেক প্রতিনিধি মুহসেন মোহাম্মাদি আরাকি; ইসফাহানের শুক্রবারের ইমাম ও তিনবারের পরিষদ সদস্য আবুলহাসান মাহদাভি; এবং আরদাবিলের শুক্রবারের ইমাম হাসান আমোলি।

সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জুরিস্টকে নিয়ে তিন সদস্যের অন্তর্র্বতী পরিষদ সাময়িকভাবে নেতৃত্ব পালন করে। তবে তাদের ক্ষমতা সীমিত এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন।

সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা কেবল রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয়ভাবে ও সংবিধানিকভাবে সীমাহীন। তিনি শিয়াদের ধর্মীয় নেতা হিসেবে কেবল একজন আয়াতুল্লাহ হতে পারেন। তার ওপর নজরদারি থাকলেও, সর্বোচ্চ নেতাকে ইসলামী বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। তার বিরোধিতা মানে বিপ্লবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হিসেবে বিবেচিত হয়।

নেতার ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান নিয়োগ, বিচার বিভাগ কর্তৃক দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষমা, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ, গণভোট ডাকা এবং প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তার নিয়োগ ও অপসারণ।

ইরানে ‘বাসিজ’ নামে পরিচিত এক কোটিরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আয়াতুল্লাহ খোমেনি এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী বিপ্লবকে সুরক্ষা দেওয়া। সরকারি নাম ‘বাসিজ অর্গানাইজেশন ফর দ্য অপপ্রেসড’।

এটি প্রথমে স্বাধীন একটি সংস্থা ছিল, তবে পরে বিপ্লবী গার্ডের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর প্রধানকেও সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করেন।

আলী খামেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, সুপ্রিম লিডার্স কাউন্সিল এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে সমন্বয় ও প্রভাব নতুন নেতার নির্বাচনে মূল ভূমিকা রাখবে।

খামেনির উত্তরসূরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামরিক সমর্থন এবং ধর্মীয় বৈধতা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই, তবে অন্তর্র্বতী পরিষদের মাধ্যমে ক্ষমতার শূন্যতা দূর করা হয়। ১৯৮৯ সালের চৌঠা জুন রাত ১০টার পর খোমেনি মৃত্যুবরণ করেন এবং পরদিন সকালে সুপ্রিম লিডার্স কাউন্সিল বৈঠক ডেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার উত্তরসূরি নির্ধারণ করে।

আলী খামেনির মৃত্যুর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কে হবেন তার উত্তরসূরি?

আলী খামেনি তার পূর্বসূরি ইমাম খোমেনির মতো ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে তুলতে পারেননি, তবে তিনি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারদের সমর্থন পেয়েছিলেন। ফলে, নতুন সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচনে বিপ্লবী গার্ডের নেতৃত্বের প্রভাব থাকতে পারে—এটি একটি বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা। খামেনির জীবদ্দশায় অনেকে মনে করতেন দুই ব্যক্তি তার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

যাদের মধ্যে রয়েছে ছেলে মুজতবা খামেনি এবং বিচার বিভাগের প্রধান এব্রাহিম রাইসি। এদের মধ্যে এব্রাহিম রাইসি ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
আর্কাইভ
© ২০২২-২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দেশ ভয়েস।
jphostbd.com