বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

হঠাৎ বন্ধ তামহা সিকিউরিটিজ : সারাজীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব মজিবুর

অনলাইন ডেস্ক
  • Update Time : শুক্রবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২, ৫:২৫ pm
  • ৪ Time View

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চাকুরে মজিবুর রহমান ভুঁইয়া ২০০৯ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। বয়স ৭০ পার হয়েছে অনেক আগেই। নিজে অসুস্থ এবং ঘরে অসুস্থ স্ত্রী আর একজন প্রতিবন্ধী মেয়ে রয়েছে। মাস শেষে পেনশন পান ১৪ হাজার টাকা। একমাত্র ছেলে সামান্য বেতনে চাকরি করেন। আরও অনেক পরিবারের মতোই সাধারণভাবেই দিন পার করছিলেন তারা। তবে একটি জায়গায় মজিবুরের গল্পটা অনেকের চেয়ে আলাদা। সারা জীবনের সঞ্চয় ১৩ লাখ টাকা ‘হারাতে’ বসেছেন তিনি। বলা যায়, হঠাৎ ‘উধাও’ হয়ে গেছে।

গেল বছর ৯ ডিসেম্বর লেনদেন বন্ধ হয়ে যায় ব্রোকারেজ হাউজ তামহা সিকিউরিটিজের; এতেই পুরো পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এ সরকারি চাকুরে। নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় ফিরে পাওয়া নিয়ে দুর্ভানা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন পার করছেন এ প্রবীণ।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্রোকারেজ হাউজটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু তিনি নন, তার মতো প্রায় দুইশ বিনিয়োগকারী নিজেদের জমা করা টাকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

তিন সপ্তাহেও এ নিয়ে প্রতিকার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করেন তামহা সিকিউরিটিজের কয়েকজন বিনিয়োগকারী; যেখানে মজিবুর রহমান তার দুর্দশার কথা ‍তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “আমি খুব বিপদে পরেছি ভাই। আমার বাঁচার কোনো পথ নাই, আমি পথ হারায় ফেলেছি।”

তিনি জানালেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে অভিযোগ করেও কাজ হয়নি। ডিএসইর কাছে অভিযোগ করেছি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (বিএসইসি) কমিশনের কাছেও অভিযোগ করেছি।

গত ৯ ডিসেম্বর ‘নিরীক্ষায় হিসাবে গড়মিল’ ধরা পড়ার পর ‘বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর স্বার্থে’ ব্রোকারেজ হাউজ তামহা সিকিউরিটিজের লেনদেন স্থগিত করে ডিএসই। মতিঝিলের ডিএসই ভবনে মূল কার্যালয় নিয়ে থাকা তামহা সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনউর রশিদ।

ওইদিন পেশায় চিকিৎসক এই উদ্যোক্তা বলেন, ব্রোকারেজ হাউজটি বিক্রি করার জন্য নিরীক্ষা চালাতে গিয়েছিলেন। অডিট করাতে গিয়ে বড় ধরনের গড়মিল পেয়েছি। বিষয়টি আরও গভীরে খতিয়ে দেখতে ডিএসইর কাছে সাহায্য চেয়েছি। তারা বলেছে, লেনদেন বন্ধ করে সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।

তবে সংবাদ সম্মেলনে বিনিয়োগকারীদের দাবি জালিয়াতির সঙ্গে মালিকপক্ষ জড়িত। তাদের দাবি, এ হাউজে ৬৮ কোটি টাকার শেয়ার ও নগদ টাকা ছিল বিনিয়োগকারীদের।

অপরদিকে ব্রোকারেজ হাউজের কর্তৃপক্ষের দাবি শেয়ার ও টাকার পরিমাণ ৬৭ কোটি টাকা, যা কর্মকর্তারা সরিয়েছেন।

বুধবার ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে প্রবীণ মজিবুর রহমানসহ ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ ফিরে পাওয়ার দাবি জানান।

এসব বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুরক্ষার বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, “আমরা যে কোনো মূল্যে বানকো ও তামহা সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দেব। এর মধ্যে তামহার মালিকদের সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু সব বিনিয়োগকারীর তথ্য পাচ্ছি না।”

ক্ষতিগ্রস্তদের সংবাদ সম্মেলন

সিএমজেএফ মিলনায়তনে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে তামহা সিকিউরিটিজের জালিয়াতিতে ক্ষতিগ্রস্ত দুই বিনিয়োগকারী।সিএমজেএফ মিলনায়তনে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে তামহা সিকিউরিটিজের জালিয়াতিতে ক্ষতিগ্রস্ত দুই বিনিয়োগকারী।সংবাদ সম্মেলনে প্রবীণ মজিবুর বলেন, অবসরের দুই বছর আগে ২০০৭ সাল থেকে ডিএসইর ব্রোকারেজ হাউজ তামহা সিকিউরিটিজের মাধ্যমে শেয়ারে বিনিয়োগ করেন তিনি।
টাকা তার হলেও বিও অ্যাকাউন্ট ছেলের নামে। মাঝে মাঝে তিনি আসতেন, ছেলেই এখানে লেনদেন করতেন। চাকরি শেষে পাওয়া ১৩ লাখ টাকার সব এ হাউজে জমা দেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন আমার ছেলে বললো সব শেয়ারতো উধাও হয়ে গেছে। তখন আমি হাউজে গিয়ে বললাম, এ অবস্থা কেন হলো। তারা কোনো জবাব দিতে পারেনি। আমরা সিডিবিএলএ গিয়ে দেখলাম আমাদের শেয়ার নেই। অথচ আমাদের পোর্টফোলিওতে শেয়ার আছে। টাকাও আছে, কান্নাজড়িত কণ্ঠে যোগ করেন হতাশ এ বিনিয়োগকারী।

তামহা সিকিউরিটিজের আরেক বিনিয়োগকারী ফখরুল ইসলাম বলেন, “আমরা অসহায় এর মতো সব জায়গায় যাচ্ছি; কিন্তু কোথাও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।”

তার অভিযোগ তামহা সিকিউরিটিজের মালিক তাদের অর্থ সরিয়েছেন। জালিয়াতি ধরতে না পারায় ডিএসই ও বিএসইসিকেও দায় দিলেন তিনি।

এর আগে এ দুজনের মতো আরও দুই ব্রোকারেজ হাউজ বানকো সিকিউরিটিজ ও ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের প্রায় নয় হাজার বিনিয়োগকারী জালিয়াতি ও অনিয়মের ফাঁদে পড়ে নিজেদের বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

কীভাবে চুরি
ব্রোকারেজ হাউজের এমন জালিয়াতির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ধোঁকা দিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে হাউজগুলো বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এর মধ্যে একটি হচ্ছে মিথ্যা বিবরণী পাঠানো। অর্থাত্ প্রতিদিন এসএমএস ও ইমেইলে বিনিয়োগকারীদের ভুয়া তথ্য পাঠিয়ে অভিযুক্ত হাউজগুলো জানায় তাদের বিনিয়োগ ঠিক আছে। অথচ পোর্টফোলিও থেকে শেয়ার বিক্রি করে এবং নগদ টাকা সরিয়ে ফেলে তারা।

বুধবার সংবাদ সম্মেলনে প্রতিদিন পাঠানো এসএমএস ও ইমেইল দেখালেন তামহা সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীরা। শেয়ার সংরক্ষণকারী কোম্পানি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডে (সিডিবিএল) গিয়ে তারা জানতে পেরেছেন বিও অ্যাকাউন্টে তাদের কোনো শেয়ার কিংবা টাকা নেই।

সংবাদ সম্মেলনে তারা বিনিয়োগের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দোষীদের শাস্তি দাবি করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
আর্কাইভ
© ২০২২-২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দেশ ভয়েস।
jphostbd.com